UCL গবেষকদের নতুন আবিষ্কার। ঘরের সাধারণ আলোতেই চার্জ হবে আপনার রিমোট, সেন্সর বা স্মার্ট ডিভাইস। ব্যাটারি পরিবর্তনের ঝামেলা শেষ, দূষণ কমবে। বিস্তারিত জানতে পড়ুন এই বিশেষ প্রতিবেদন।
ব্যাটারি হীন ভবিষ্যতের দিকে এক নতুন পদক্ষেপ
ঘরের ভেতরকার সাধারণ আলো, যা এতদিন শুধু অন্ধকার দূর করত, তা-ই এবার আপনার ইলেকট্রনিক গ্যাজেটকে শক্তি জোগাবে। শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটাই এখন বাস্তব। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের (UCL) একদল গবেষক সম্প্রতি এমন এক ক্ষুদ্র সৌর কোষ (solar cell) আবিষ্কার করেছেন, যা ঘরের কৃত্রিম আলো ব্যবহার করে ডিভাইস চার্জ করতে সক্ষম। এই আবিষ্কার ব্যাটারি-নির্ভর গ্যাজেটের যুগকে বিদায় জানিয়ে এক নতুন, ব্যাটারিমুক্ত এবং পরিবেশবান্ধব ভবিষ্যতের পথ খুলে দিচ্ছে।
ব্যাটারির সমস্যা এবং নতুন সমাধান
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা অজস্র ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করি—রিমোট কন্ট্রোল, ওয়্যারলেস কীবোর্ড, স্মার্ট সেন্সর, অ্যালার্ম সিস্টেম, ইত্যাদি। এই সব ডিভাইসকে সচল রাখতে প্রয়োজন হয় ব্যাটারির। কিন্তু ব্যাটারির ব্যবহার পরিবেশের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। লিথিয়াম এবং অন্যান্য ভারী ধাতু দিয়ে তৈরি এই ব্যাটারিগুলো নির্দিষ্ট সময় পর পর পরিবর্তন করতে হয় এবং এগুলো সঠিকভাবে পুনর্ব্যবহার (recycle) করা না হলে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করে।
‘ইন্টারনেট অফ থিংস’ (IoT)-এর এই যুগে, যখন প্রতিটি জিনিসই ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযুক্ত, তখন ব্যাটারির চাহিদা আরও কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। এই বিপুল পরিমাণ ব্যাটারি বর্জ্য পরিবেশের ওপর যে চাপ সৃষ্টি করবে, তা ভয়াবহ। এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তির পথ খুঁজতে বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরে গবেষণা করছিলেন, এবং অবশেষে সাফল্য এসেছে। UCL-এর গবেষকদের তৈরি নতুন এই সৌর কোষ প্রচলিত সৌর কোষের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটি সূর্যের তীব্র আলোর বদলে ঘরের ভেতরে থাকা কম শক্তির আলো, যেমন LED বা ফ্লুরোসেন্ট বাল্বের আলো শোষণ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে।
পেরোভস্কাইট ম্যাজিক: নতুন যুগের সৌর কোষ
এই নতুন প্রযুক্তির মূল উপাদান হলো ‘পেরোভস্কাইট’ (Perovskite)। এটি এক ধরনের ক্রিস্টালাইন উপাদান যা বহিরাঙ্গনের সৌর প্যানেলেও ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রচলিত সিলিকন-ভিত্তিক সৌর প্যানেল যেখানে কেবল সূর্যের আলোর নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্য শোষণ করতে পারে, সেখানে পেরোভস্কাইটের গঠন এমনভাবে পরিবর্তন করা যায়, যাতে এটি ঘরের আলোর নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্য শোষণ করতে পারে। এই পেরোভস্কাইট-ভিত্তিক সৌর কোষগুলো প্রচলিত ইনডোর সোলার সেলের তুলনায় প্রায় ছয় গুণ বেশি কার্যকর।
এই গবেষণার সিনিয়র গবেষক ড. মোজতাবা আবদি জালেবি জানিয়েছেন, “কোটি কোটি ডিভাইস সামান্য শক্তির জন্য ব্যাটারির ওপর নির্ভরশীল, যা একটি অস্বাস্থ্যকর চর্চা। ইন্টারনেট অফ থিংস যত প্রসারিত হবে, এই সংখ্যা ততই বাড়বে। বর্তমানে ইনডোর লাইট থেকে শক্তি সংগ্রহকারী সৌর কোষগুলো ব্যয়বহুল এবং অদক্ষ। কিন্তু আমাদের তৈরি বিশেষভাবে তৈরি পেরোভস্কাইট ইনডোর সোলার সেল বাণিজ্যিক সেলের চেয়ে অনেক বেশি শক্তি সংগ্রহ করতে পারে এবং এটি অন্যান্য প্রোটোটাইপের চেয়েও বেশি টেকসই।”
চ্যালেঞ্জ এবং সাফল্য
পেরোভস্কাইট নিয়ে গবেষণার একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল এর স্থায়িত্ব। এর ক্রিস্টাল গঠনে কিছু ক্ষুদ্র ত্রুটি থাকে, যাকে বলা হয় ‘ট্র্যাপ’। এই ত্রুটিগুলোর কারণে ইলেকট্রন আটকে যেতে পারে এবং তাদের শক্তি পুরোপুরি ব্যবহার করা যায় না। ফলে ডিভাইসটি দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কিন্তু UCL-এর গবেষকরা রাসায়নিক পদার্থের এক বিশেষ সংমিশ্রণ ব্যবহার করে এই ত্রুটিগুলো কমাতে সক্ষম হয়েছেন।
গবেষণার প্রধান লেখক সিমিং হুয়াং এই প্রক্রিয়াটিকে একটি কেকের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, “এই ছোট ত্রুটিগুলোযুক্ত সৌর কোষটি যেন টুকরো টুকরো করা একটি কেক। বিভিন্ন কৌশলের সমন্বয়ে আমরা এই কেকটিকে আবার জোড়া লাগিয়েছি, যার ফলে চার্জ আরও সহজে এর ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে।”
তাদের এই নতুন কৌশল পেরোভস্কাইট সৌর কোষকে কেবল আরও কার্যকরই করেনি, বরং এর স্থায়িত্বও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এই নতুন কোষগুলো ১০০ দিনের বেশি সময় ধরে তাদের কার্যকারিতার ৯২% ধরে রাখতে পেরেছে, যেখানে ত্রুটিপূর্ণ পেরোভস্কাইট মাত্র ৭৬% কার্যকারিতা ধরে রেখেছিল। এমনকি ৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ৩০০ ঘণ্টা একটানা তীব্র আলোর নিচে পরীক্ষা করেও এটি তার কার্যকারিতার ৭৬% ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
কার্যকারিতার রেকর্ড
গবেষকদের দাবি, তাদের তৈরি এই পেরোভস্কাইট কোষগুলো একটি নতুন বিশ্ব রেকর্ড স্থাপন করেছে। একটি ভালোভাবে আলোকিত অফিসের মতো ১০০০ লাক্স (lux) আলোতে এই কোষগুলো ৩৭.৬% আলো বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তরিত করতে সক্ষম। এটি বর্তমানে বাজারে থাকা সেরা বাণিজ্যিক ইনডোর সোলার সেলের চেয়ে প্রায় ছয় গুণ বেশি।
এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি খুবই কম খরচে এবং সহজ প্রক্রিয়ায় তৈরি করা যায়। ড. জালেবি বলেন, “পেরোভস্কাইট সৌর কোষের সুবিধা হলো, এগুলো কম খরচে তৈরি করা যায়। কারণ এতে পৃথিবীর সহজলভ্য উপাদান ব্যবহৃত হয় এবং প্রক্রিয়াকরণও খুব সহজ। এটি অনেকটা সংবাদপত্রের মতোই প্রিন্ট করা যায়।”
প্রভাব এবং ভবিষ্যৎ
এই আবিষ্কারের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। স্মার্ট হোম এবং স্মার্ট সিটি প্রযুক্তিতে এটি বিপ্লব ঘটাতে পারে। ঘরের প্রতিটি ওয়্যারলেস ডিভাইস, যেমন স্মার্ট লাইট, তাপমাত্রা সেন্সর, সিকিউরিটি ক্যামেরা, এমনকি স্মোক ডিটেক্টর, সবকিছুই ব্যাটারির ঝামেলা ছাড়াই কাজ করতে পারবে। এতে একদিকে যেমন ব্যাটারি বর্জ্য কমবে, তেমনি ডিভাইসগুলোর আকার আরও ছোট করা সম্ভব হবে এবং রক্ষণাবেক্ষণ খরচও কমে আসবে।
বর্তমানে বিজ্ঞানীরা এই প্রযুক্তি বাণিজ্যিকীকরণের জন্য বিভিন্ন শিল্প অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা করছেন। খুব দ্রুতই হয়তো আমরা এমন গ্যাজেট দেখতে পাবো, যা শুধুমাত্র ঘরের আলোতেই স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে কাজ করে। এই প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে আরও সহজ, পরিচ্ছন্ন এবং পরিবেশবান্ধব করে তুলবে। বাংলাদেশের মতো দেশ, যেখানে পরিবেশ দূষণ একটি বড় সমস্যা, সেখানে এই প্রযুক্তি ব্যাটারি বর্জ্য কমাতে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
UCL-এর এই গবেষণা কেবল একটি বৈজ্ঞানিক সাফল্য নয়, বরং এটি একটি টেকসই ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি। ব্যাটারিমুক্ত গ্যাজেটের এই ধারণা এক সময় ছিল কল্পবিজ্ঞানের অংশ, কিন্তু এখন তা বাস্তবতার খুব কাছাকাছি। এই ক্ষুদ্র সৌর কোষগুলো আমাদের ঘরের আলোর প্রতিটি কণাকে মূল্যবান সম্পদে পরিণত করবে এবং আগামী প্রজন্মের জন্য এক পরিচ্ছন্ন পৃথিবী গড়ার পথে এক বড় পদক্ষেপ হবে।
- Yamaha XSR155: নয়া রেট্রো বাইকের যুগে Yamaha-র বাজিমাত
- OPPO Find X9 Pro: ২০০MP Hasselblad ক্যামেরা, বিশাল ৭৫০০mAh ব্যাটারি, আপোষহীন স্মার্টফোন
- HMD Touch Hybrid: 3,999 টাকায় HMD-এর প্রথম টাচ হাইব্রিড ফোন – কমপ্যাক্ট ডিজাইন ও নতুন অভিজ্ঞতা
- Honor AI: অনার রোবট Ai ফোন, আসতে চলেছে
- iPhone Air 17- ডিজাইন ও পারফরম্যান্সে কতটা ‘হালকা’ অ্যাপলের এই নতুন চমক
- ২০২৫ সালে ভারতের অ্যাডভেঞ্চার বাইক সেগমেন্ট: TVS RTX 300, Himalayan 450 ও KTM Adventure-এর তুলনামূলক আলোচনা