৫% GST স্ল্যাবের দাবি, মোবাইল ফোন নির্মাতাদের উৎপাদন বৃদ্ধিতে নতুন দিশা

মোবাইল ফোন নির্মাতারা ৫% GST স্ল্যাবের দাবি করছে, লক্ষ্য সাশ্রয়ী মূল্য এবং দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধির

মোবাইল ফোন নির্মাতাদের সংগঠন ICEA-এর পক্ষ থেকে হ্যান্ডসেটের ওপর জিএসটি কমানোর দাবি। 12% থেকে 18% জিএসটি বৃদ্ধির পর দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন কমেছে। দেশীয় উৎপাদন ও সাশ্রয়ী মূল্যে হ্যান্ডসেট সরবরাহে ৫% জিএসটি স্ল্যাব জরুরি বলে মনে করছে সংস্থা।

ভারতের মোবাইল ফোন শিল্পে বর্তমানে এক বিশাল অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে স্মার্টফোন এবং অন্যান্য মোবাইল হ্যান্ডসেটের উপর জিএসটি (GST) হার বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশীয় উৎপাদন এবং বাজারে চাহিদা উভয়ই ব্যাপক ধাক্কা খেয়েছে। এই পরিস্থিতিতে, ইন্ডিয়া সেলুলার অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স অ্যাসোসিয়েশন (ICEA), যা ভারতের বৃহত্তম মোবাইল ফোন প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলির প্রতিনিধিত্ব করে, কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে হ্যান্ডসেটের উপর জিএসটি হার বর্তমান ১৮% থেকে কমিয়ে ৫% করার জন্য একটি জোরালো আবেদন জানিয়েছে।

5% GST
ছবি সৌজন্যেঃ google AI

জিএসটি বৃদ্ধির প্রভাব: এক ধাক্কায় কমেছে উৎপাদন

২০২০ সালের বাজেটে জিএসটি কাউন্সিল মোবাইল ফোনের উপর করের হার ১২% থেকে বাড়িয়ে ১৮% করে দেয়। এই সিদ্ধান্তের ফলে হ্যান্ডসেটের দাম অনেকটাই বেড়ে যায়, যা সরাসরি গ্রাহকদের ক্রয়ক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলেছে। আইসিইএ-এর প্রেসিডেন্ট পঙ্কজ মহিন্দ্রু জানান, জিএসটি বৃদ্ধির পর থেকেই মোবাইল ফোন উৎপাদন ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। পূর্বে যেখানে ভারতে বছরে প্রায় ৩০ কোটি ইউনিট মোবাইল ফোন তৈরি হতো, বর্তমানে তা কমে ২২ কোটি ইউনিটে এসে দাঁড়িয়েছে। এই পরিসংখ্যান শুধু শিল্পের জন্যই নয়, দেশের ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ এবং ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’ উদ্যোগের জন্যও একটি বড় ধাক্কা।

কেন ৫% GST-র দাবি?

মোবাইল ফোন নির্মাতারা মনে করেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে মোবাইল ফোন শিল্পের গুরুত্ব অপরিসীম। মোবাইল ফোন এখন শুধু একটি বিলাসবহুল পণ্য নয়, বরং এটি দৈনন্দিন জীবনের একটি অপরিহার্য অঙ্গ। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মোবাইলের ব্যবহার ক্রমাগত বাড়ছে। তাই, এর দাম বাড়লে সরাসরি সমাজের বৃহত্তর অংশের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

আইসিইএ-এর দাবি, জিএসটি কমানো হলে মোবাইল ফোনের দাম কমবে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আসবে। এর ফলে চাহিদা বৃদ্ধি পাবে এবং দেশীয় উৎপাদন পুনরায় বাড়ানো সম্ভব হবে। এছাড়াও, পঙ্কজ মহিন্দ্রু আন্তর্জাতিক বাজারের উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, চীন সহ অন্যান্য অনেক দেশেই সরকার মোবাইল ফোন উৎপাদনে সরাসরি ভর্তুকি দেয়, যা তাদের বাজারে মোবাইল ফোনের দাম তুলনামূলকভাবে কম রাখে। এর ফলে তারা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকে। ৫% জিএসটি কার্যকর হলে ভারতও সেই প্রতিযোগিতার বাজারে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করতে পারবে।

অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব

জিএসটি কমানোর এই প্রস্তাব যদি সরকার গ্রহণ করে, তবে এর সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে ভারতের অর্থনীতিতে।

১. চাহিদা ও উৎপাদন বৃদ্ধি: মোবাইল ফোনের দাম কমলে বিশেষ করে মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর গ্রাহকরা উপকৃত হবেন। এর ফলে স্মার্টফোন কেনার প্রবণতা বাড়বে, যা উৎপাদনকারী সংস্থাগুলিকে আরও বেশি ইউনিট তৈরি করতে উৎসাহিত করবে।

২. ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ এবং কর্মসংস্থান: উৎপাদন বাড়লে কারখানায় আরও বেশি কর্মীর প্রয়োজন হবে। এটি সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করবে, যা বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দার সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশীয় উৎপাদন বাড়লে ভারতকে আমদানির উপর নির্ভর করতে হবে না, যা বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় বাড়াবে।

৩. ডিজিটাল বিভাজন হ্রাস: সাশ্রয়ী মূল্যে স্মার্টফোন সহজলভ্য হলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ডিজিটাল পরিষেবা পৌঁছানো সম্ভব হবে। এটি সরকারের ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’ মিশনকে আরও ত্বরান্বিত করবে এবং সমাজের সব স্তরের মানুষকে ডিজিটাল বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত করবে।

৪. রাজস্ব বৃদ্ধি: অনেকেই ভাবতে পারেন যে জিএসটি কমালে সরকারের রাজস্ব কমে যাবে। তবে আইসিইএ মনে করে, করের হার কমালেও যদি পণ্যের বিক্রি কয়েকগুণ বেড়ে যায়, তবে সামগ্রিকভাবে সরকারের রাজস্ব বরং বৃদ্ধি পাবে।

ভবিষ্যতের পথ

মোবাইল ফোন শিল্প বর্তমানে একটি ক্রান্তিলগ্ন পার করছে। একদিকে, প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি এবং অন্যদিকে, উচ্চ করের চাপ। এই অবস্থায় নির্মাতাদের দাবি সরকার কতটুকু বিবেচনা করে তা দেখার বিষয়। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং ডিজিটাল অগ্রগতির ধারা অব্যাহত রাখতে হলে মোবাইল ফোন শিল্পের এই দাবিকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা উচিত। সরকার যদি উৎপাদনকারীদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি যুক্তিসঙ্গত সমাধানে আসে, তবে তা দেশের প্রযুক্তি খাতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে এবং ‘আত্মনির্ভর ভারত’-এর স্বপ্ন পূরণে সাহায্য করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *