AI-এর জনক জিওফ্রে হিন্টন বলছেন, এআই কোম্পানিগুলো মুনাফার দিকে এত বেশি মনোযোগী যে তারা মানবতা এবং দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির কথা ভুলে যাচ্ছে। কেন এই মুনাফাকেন্দ্রিকতা এআই-এর সত্যিকারের বিপদ।
প্রযুক্তির জগতে এখন সবথেকে বড় আলোচনার বিষয় হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence)। চ্যাটজিপিটি (ChatGPT) থেকে শুরু করে নিত্যনতুন সব এআই টুল, আমাদের জীবনযাত্রাকে প্রতিনিয়ত বদলে দিচ্ছে। কিন্তু এই দ্রুতগতির উন্নতির পেছনে লুকিয়ে আছে এক গভীর উদ্বেগ। এই উদ্বেগের কথা বারবার তুলে ধরছেন এমন একজন ব্যক্তি, যিনি নিজেই এই প্রযুক্তিকে বর্তমান রূপে আনতে সাহায্য করেছেন – জিওফ্রে হিন্টন। তাঁকে বলা হয় ‘গডফাদার অফ এআই’ (Godfather of AI)। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি এআই কোম্পানিগুলোর ভুল কৌশল নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলছেন, কোম্পানিগুলো মুনাফার পেছনে ছুটতে গিয়ে এমন কিছু ভুল করছে, যা ভবিষ্যতের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
AI-এর লাভের দৌড়, নীতিগত কাঠামোর অভাব
জিওফ্রে হিন্টনের মতে, কোম্পানিগুলো এআই মডেলকে আরও দ্রুত এবং শক্তিশালী করার জন্য বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। তাদের লক্ষ্য একটাই: প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে এগিয়ে থাকা এবং আরও বেশি লাভ করা। এই ‘অস্ত্র প্রতিযোগিতা’ (arms race) মানবজাতির জন্য চরম বিপদ ডেকে আনতে পারে। তিনি সতর্ক করে বলছেন, যদি সঠিকভাবে মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে এআইকে যুক্ত করা না যায়, তাহলে এই সুপারইন্টেলিজেন্ট সিস্টেমগুলো নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়তে পারে।
হিন্টনের মতে, কর্পোরেট এআই কৌশলের সবথেকে বড় ত্রুটি হলো একটি নৈতিক কাঠামোর (moral framework) অভাব। কোম্পানিগুলো যখন মডেল স্কেলিং এবং ব্যবহারকারীর ডেটা থেকে অর্থ উপার্জনে ব্যস্ত, তখন খুব কম প্রতিষ্ঠানই আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স (AGI) থেকে আসা অস্তিত্বের ঝুঁকি (existential risks) নিয়ে আলোচনা করছে। তিনি এই চ্যালেঞ্জকে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধের সঙ্গে তুলনা করে বৈশ্বিক সহযোগিতা, নজরদারি এবং একটি সমন্বিত নৈতিক মানদণ্ডের আহ্বান জানিয়েছেন।
চাকরি হারানো বা ভুয়া তথ্যের চেয়েও বড় বিপদ
সাধারণত, এআই নিয়ে মানুষের প্রধান উদ্বেগ থাকে চাকরি হারানোর ভয় বা ভুয়া তথ্য ছড়ানোর মতো বিষয়গুলো। কিন্তু জিওফ্রে হিন্টন বলছেন, এই সমস্যাগুলো বরফের চূড়ামাত্র। আসল বিপদ অনেক গভীর। তিনি মনে করেন, এআই এমনভাবে বিকশিত হতে পারে যে তা মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। এআই নিজেই একটি বিপজ্জনক সত্তা (bad actor) হয়ে উঠতে পারে, যার লক্ষ্য আমাদের ভালোর চেয়ে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করা।
হিন্টন আরও ব্যাখ্যা করেন, এআই-এর গবেষণা এখন মানবজাতির টিকে থাকার দীর্ঘমেয়াদি প্রশ্নের পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক লাভের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। তিনি বলেন, “কোম্পানিগুলোর মালিকদের জন্য, গবেষণার মূল চালিকাশক্তি হলো স্বল্পমেয়াদি লাভ।” এআই যদি শুধুমাত্র মুনাফার দিকে মনোযোগী হয়, তাহলে এটি এমন ঝুঁকি তৈরি করবে যা আজকের সাইবারক্রাইম বা ভুয়া খবরের চেয়ে অনেক বেশি ভয়াবহ।
AI-এর ‘ধীরে চলো’ নীতি এবং নিরাপত্তা
হিন্টনের মূল বার্তাটি খুবই স্পষ্ট: এআই এর অগ্রগতিকে ধীরে করা উচিত। তিনি মনে করেন, প্রযুক্তি যে গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, সমাজ সেই গতিতে এর প্রভাব বুঝতে বা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম নয়। তাই তিনি গবেষক, নিয়ন্ত্রক এবং প্রযুক্তি নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি চিন্তাভাবনাকে গুরুত্ব দিতে।
এক সাক্ষাৎকারে হিন্টন বলেন, বেশিরভাগ অর্থই এআইকে আরও শক্তিশালী করার দিকে যাচ্ছে, এটিকে নিরাপদ করার দিকে নয়। তিনি ‘অ্যালাইনমেন্ট রিসার্চ’ (alignment research) বা এআইকে মানবজাতির স্বার্থে কাজ করার জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়ার গবেষণায় বিনিয়োগের ওপর জোর দেন। তার মতে, এটি না হলে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
মাতৃত্বের দৃষ্টান্ত: এক ভিন্ন সমাধান
জিওফ্রে হিন্টন এআই-এর নিরাপত্তার জন্য একটি অনন্য সমাধান প্রস্তাব করেছেন। তিনি বলছেন, এআই সিস্টেমের মধ্যে “মাতৃত্বের প্রবৃত্তি” (maternal instincts) স্থাপন করা যেতে পারে। প্রকৃতি থেকে উদাহরণ টেনে তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে একটি কম বুদ্ধিমান সত্তাকে (শিশুকে) একটি বেশি বুদ্ধিমান সত্তা (মা) নিয়ন্ত্রণ করে। যদি মেশিনকে মানুষের কল্যাণের প্রতি যত্নশীল হতে শেখানো যায়, তাহলে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সম্ভব। তিনি সতর্ক করে বলেন, “যদি এআই আমাকে লালন-পালন না করে, তবে এটি আমাকে প্রতিস্থাপন করবে।” তিনি আরও অনুমান করেন, আগামী তিন দশকের মধ্যে এআই-এর কারণে মানবজাতির বিলুপ্তির অন্তত ১০% সম্ভাবনা রয়েছে।
ভুল স্বীকার এবং ভবিষ্যতের সতর্কতা
২০২৩ সালে জিওফ্রে হিন্টন গুগল থেকে চাকরি ছাড়েন, যাতে তিনি এআই-এর ঝুঁকি নিয়ে স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারেন। তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন যে, তিনি তার কর্মজীবনের শুরুতে এআই-এর নিরাপত্তা নিয়ে যথেষ্ট সচেতন ছিলেন না। তিনি বলেন, “আমার অনেক আগেই বোঝা উচিত ছিল যে এর সম্ভাব্য বিপদগুলো কী হতে পারে।”
তাঁর এই সতর্কবাণী থেকে এটি স্পষ্ট যে, এআই বিপ্লব শুধু নতুন সুযোগ তৈরি করছে না, বরং এর সঙ্গে আসছে অভূতপূর্ব ঝুঁকি। এআই কোম্পানিগুলোর উচিত কেবল মুনাফার দিকে না তাকিয়ে, মানবজাতির দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া। নইলে, এআই যে সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা, সেই সভ্যতার অস্তিত্বই একদিন হুমকির মুখে পড়তে পারে।